আসামির স্বীকারোক্তির পরও প্রমাণ মেলেনি ডিএনএ টেস্টে; ১১ মাস ২১ দিন কারাভোগের পর জামিন



শফিউল আলম রাজীব,
দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি//

কুমিল্লার দেবীদ্বারে ধর্ষন আইনে দায়ের করা মামলায় প্রথমে আসামির স্বীকারোক্তি ও পরে সন্তান ভূমিষ্ঠের পর ডিএনএ পরীক্ষার ফল ভিন্ন হওয়ায় ১১ মাস ২১দিন কারাগারে থাকা সোহাগ নামে এক আসামীকে জামিন দিয়েছে আদালত।

উচ্চ আদালতের জামিন আদেশের ১ মাস ২১দিন পর রোববার রাতে কুমিল্লা কেন্দ্রেীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন সেই যুবক। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোঃ শাহজাহান আহমেদ বলেন, রোববার সোহাগের জামিনের কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছে। এরপর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার রাতে কারাগার থেকে সে মুক্তি পায়।

চলতি বছরের গত ৮আগষ্ট (সোমবার) উচ্চ আদালত তার জামিন মঞ্জুর করলেও জামিনের আদেশ কুমিল্লায় পৌঁছতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় মাসেরও বেশি। একইসঙ্গে আদেশে বলা হয়েছে, বিচারিক আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আসামি জামিনে থাকবেন।

কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর বিনাইপাড় গ্রামে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের এক ধর্ষণ মামলার অভিযুক্ত আসামির জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল- যথাযথ ঘোষণা করে গত ৮আগষ্ট সোমবার বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক ও বিচারপতি কে এম ইমরুল কায়েসের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোঃ একরামুল হক বাকি। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ সাইফুদ্দিন খালেদ।

আসামী পক্ষের কুমিল্লা বারের আইনজীবি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক এপিপি এডভোকেট সৈয়দ তানভীর আহমেদ ফয়সাল বলেন, 'ডিএনএ' টেস্ট রিপোর্ট ভিন্ন আসায় আদালত অভিযুক্তকে জামিন দিয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ জামিন বহাল থাকবে বলে আদালতের আদেশে বলা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ওই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার যুবককে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রুল দিয়েছিল হাই কোর্ট। সেই রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে আদালত। এ রায়ের ফলে কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৪ এ ধর্ষণের অভিযোগে বিচারাধীন মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই যুবক জামিনে থাকবেন। এর অর্থ আসামি স্থায়ী জামিন পেলেন। আমরা আশা করছি বিচারিক আদালতেও আসামি ন্যায়বিচার পাবেন। আসামি দীর্ঘ ১১ মাস মাস ২১ দিন হাজতবাস করার পর কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, মামলার তথ্য থেকে জানা যায় ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর দেবীদ্বার থানায় ধর্ষণের অভিযোগে ওই যুবককে একমাত্র আসামি করে কিশোরীটির মা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ওই যুবককে ওই দিন রাতেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় ওই যুবকের বিরুদ্ধে ‘কৌশলে বিয়ের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণের’ অভিযোগ আনা হয়। এজাহারে বলা হয়, প্রতিবেশী ওই কিশোরীকে প্রথমবার ধর্ষণের পরও ভয় দেখিয়ে পরে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ওই যুবক। একপর্যায়ে কিশোরীটি অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি তার পরিবারকে জানায়। মামলা দায়েরের সময় কিশোরী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

২০২১ সালের অক্টোবরে মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার যুবক ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় এক পর্যায়ে বিয়ের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে দুই পরিবারের মধ্যে এ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় তা আর হয়নি।

গত ১৩ জুন কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হাসান। আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, "ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যুবক (আসামি) কিশোরীর নবজাতক পুত্র সন্তানের জৈবিক পিতা নয়"। এরপর ২৬ জুলাই ওই ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে হাই কোর্টে যুবকের পক্ষে সম্পূরক আবেদন করা হয়। এরপর গত ২৮ জুলাই আবেদনের শুনানি নিয়ে সোমবার জামিনের এ রায় দিল আদালত।

এব্যাপারে দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ নাজমুল হাসান জানান, বাচ্চার ডিএনএনএ পরীক্ষায় অভিযুক্ত সোহাগের ডিএনএন টেষ্ট এর সাথে মিল পাওয়া যায়নি। তদন্তকালে ওই ঘটনার সাথে সোহাগের বন্ধু একই গ্রামের আলমগীর হোসেন’র পুত্র লিমনের সম্পৃক্তা পাওয়ায় তাকে আটক করে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকার সত্যতা স্বীকার করে ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট ১৬৪ ধারায় জবানবন্ধী প্রদান করলে ম্যাজিষ্ট্রেট লিমনকে জেল হাজতে প্রেরনের নির্দেশ দেয়। সে বর্তমানে কারাগারে আছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post