শফিউল আলম রাজীব,
দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি//
দেবীদ্বারে দশম শ্রেনীর এক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোকতল হোসেনকে অবরুদ্ধ করে পুলিশের উপস্তিতিতে তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেল ও তার মেয়ের জামাইর আরেকটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
সংবাদ পেয়ে বুধবার বিকেলে দেবীদ্বার সার্কেল এএসপি আমিরুল্লাহ ও দেবীদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ কমল কৃষ্ণ ধরের নেতুত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা চালায়। এসময় পুলিশও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং রাতে স্কুল ক্যাম্পাসের সমস্ত বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ বিপুল পরিমান ফাকাগুলি ছুড়ে এতে অন্তত: ১৫জন গুলিবিদ্ধ হয়, গুলিবিদ্ধ মারাত্মক আহত ৮ জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। অপরদিকে বিক্ষুব্ধ জনতা চকলেট বোমা বিস্ফোরনে এলাকা আতঙ্কতি করে তোলে এবং বিদ্যালয়ের দরজা জানালা ভাংচুর করে।
রাত পৌনে ৯ টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান বিপুল সংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার অবরুদ্ধ থেকে ফাকাগুলি ও লাঠি চার্জে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে প্রধান শিক্ষকসহ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে আনার পথে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া করে। এসময় ডিবি পুলিশসহ ৩ পুলিশকে আটক করে রাখার সংবাদ পাওয়া যায়। রাত ৯ টায় আটক পুলিশ সদস্যদের উদ্ধারে এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।
দুপুরে ছাত্রীকে শ্লিলতাহানীর ঘটনার পর ছাত্রছাত্রীরা ওই শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়। পরে তাঁকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করে ছাত্র, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। অবরুদ্ধ প্রধান শিক্ষক দেবীদ্বার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (১৫ মার্চ) সকাল অনুমান সাড়ে ৮টায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে এবং দ্বীতীয়বার ১১ টায় প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেনী কক্ষে। ওই ঘটনায় ছাত্রীর সহপাঠিরাসহ তাকে নিয়ে বাড়ি গিয়ে তার বাবার কাছে ঘটনা বর্ণনা দেয়। এদিকে ঘটনাটি জানাজানির পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী প্রধান শিক্ষকের কার্যালয় ঘেরাউ করে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিসহ অন্যান্য সদস্য, শিক্ষক ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগীতায়ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেনি। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান শিক্ষককে স্কুল মাঠে এনে বিচারের দাবী জানায়। এসময় পুলিশের উপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের দরজা-জানালা এবং প্রধান ফটক ভাংচুরের চেষ্টা করে।
প্রধান শিক্ষককে রক্ষায় তারপক্ষে বহিরাগত কিছু লোকজন এসে ছাত্রদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ হামলায় অন্তত ২৫-৩০জন শিক্ষার্থী আহত হয়। আহত, নাঈম খন্দকার, মো. নাঈম ও জিহাদুল ইসলাম জানায় প্রধান শিক্ষকের ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। আহত শিক্ষার্থীদের দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আহতরা সবাই ওই বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেনীর ছাত্র।
এদিকে রাতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি বর্ষণে আরো অন্তত ১৫-২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতরা হলেন, সিয়াম (১৫), মিনহাজ (১৭), অলি (১৬), আকাশ (১৬) আরিফুল ইসলাম (২৬), সাব্বির (১৮) ও হৃদয় (১৭)। এদের প্রত্যেকেকে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেরণ করা হয়েছে।
পুলিশ, স্থানীয় ও শিক্ষার্থীরা জানায়, ওই প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন ছাত্রীদের। ক্ষুব্ধ হয়ে আজ সকালে তাঁকে এক ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় অবরুদ্ধ করে রাখে ছাত্র-ছাত্রীরা। পরে প্রধান শিক্ষকের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তাকে অবরুদ্ধ করে তার ও তার মেয়ের জামাইর ব্যবহৃত মোটর সাইকেল দু’টিতে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। এ সময় প্রধান শিক্ষক মোকতল হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, দুর্ব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ তোলে তারা। খবর পেয়ে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও অভিভাবকরাও বর্তমান আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে কর্মসসূচিতে অংশ নেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতে অতিরিক্ত পুলিশ এনে রাত সাড়ে ৯ টায় পরিস্থিতি শান্ত করে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করে।
ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোকতল হোসেন বলেন, ‘আমি চক্রান্তের শিকার।’
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কমল কৃষ্ণ ধর, দেবীদ্বার সার্কেল এএসপি আমিরুল্লাহ, কুমিল্লা পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নানকে একাধিকবার ফোন করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে রাত ১০ টা এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসেনি। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া অব্যাহত আছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।




Post a Comment